অপরাধ চট্টগ্রাম

শিল্পপতি মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের গুলি বর্ষণ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক
নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় এক শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করেছে দুর্বৃততরা।
শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে স্মার্ট গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি মুজিবুর রহমানের বাড়িতে মুখোশধারীরা এ ঘটনা ঘটায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ওই সময় ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতেই ছিলেন। তবে গুলির ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী বাহিনীর অনুসারীরা বাড়ি লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি করেছে।
এই ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চাঁদার জন্য ভয় দেখাতেই বাড়ির সামনে ও পেছনে গুলি করা হয়েছে। একটি মাইক্রোবাসে ৮ জন মুখোশধারী এসেছিল। এরপর পিস্তল উঁচিয়ে কয়েক রাউন্ড ফায়ার করে তারা চলে যায়।’
তিনি বলেন, ‘তিনি জানিয়েছেন তাকে একটি দুবাইভিত্তিক নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি কাউকে বলেননি। তারা সবাই বড় সাজ্জাদের অনুসারী বলে আমরা ধারণা করছি। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েছি। অপরাধীদের সনাক্তের কাজ চলছে।
ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে চট্টগ্রাম-১৬ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন।
মুজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে, ‘বড় সাজ্জাদের পরিচয় দিয়ে একটি বিদেশি নম্বর থেকে মাস দেড়েক আগে ফোন করে আমাকে যোগাযোগ করতে বলা হয়। আমি বিষয়টি তেমন আমলে নেইনি। দুইবার ফোন করা হয়েছিল। আজকের ঘটনার সময় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার বাড়ির সামনে এসেছিল অজ্ঞাতরা।’
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। তালিকা অনুসারে তার নাম সাজ্জাদ হোসেন খান।
পুলিশ জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার ৫ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন। আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন।

কে এই সাজ্জাদ
চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস হলেও নগরের অপরাধজগতে তাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ৬ নেতা–কর্মীসহ ৮ জনকে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে–৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন।
তার পর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন তার বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পান তিনি।
শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে এই বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ই নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।
এরপর ২০১৫ সাল থেকে বাহিনীর নেতৃত্ব নেন বুড়ির নাতি খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ডাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয় নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শ্যুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।
এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।

 

Related Posts