সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় ৯ ফায়ারকর্মীসহ ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত, গুরুতর আহত ও দ্বগ্ধ হয়েছে প্রায় ৫ শতাধিক। তন্মধ্যে গুরুতর আহত ৯ জনকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেয়া হয়েছে। দগ্ধ ও আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিএমএইচ, জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ। গতকাল শনিবার (৪ জুন) রাতে এ কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ডের সময় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিক ভর্তি ড্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ডিপোতে বিপুল পরিমাণ ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড’ দাহ্য রাসায়নিক ছিল বলে অনেকে ধারণা করছেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। এরপর ইউনিট বেড়ে ২৫টিতে দাঁড়ায়। এখন ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের প্রায় ২’শ কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর ও কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনার ২২ ঘণ্টা পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। চারদিকে স্বজনদের আহাজারি ও শোকের মাতম চলছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে হতাহতদের এক নজর দেখতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে ছুটে যান শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আশরাফ উদ্দিন, পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ আনোয়ার হোসেন, সেনাবাহিনীর ১২ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আলম, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার এস.এম রশিদুল হক ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা। এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে এ ধরণের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য জেলা প্রশাসনের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মোঃ বদিউল আলমকে আহবায়ক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার তদস্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, লাশের সারি আরও দীর্ঘ হতে পারে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এদিকে আহতও দ্বগ্ধদের সুচিকিৎসায় সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের সর্বস্তরের চিকিৎসকদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে রাসায়নিক ও সাধারণ কনটেইনার আলাদা করার চেষ্টা চলছে। আর যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রায় ২’শ জনবল এখানে কাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিসের ডিজি আরও বলেন, রাসায়নিক পদার্থ যেগুলো বের হয়ে গেছে, তা বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো রাসায়নিক যেন সাগরে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য সেনাবাহিনীর একটি দক্ষ দল কাজ করছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দিতে আরও সময় লাগবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার এক পর্যায়ে কেমিক্যাল কন্টেইনারে বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা। ভেঙে পড়ে আশপাশের ঘরবাড়ির জানালার কাঁচ। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচ ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আগুনে দগ্ধ কয়েকজনকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর আহতদের ঢাকায় এনে উন্নত চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, চমেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে ৫২ জন এবং অর্থোপেডিক বিভাগে ১৫ জন ভর্তি রয়েছে। চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫২ জন বার্ণ ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই শ্বাসনালী পোড়া। তাদের বাঁচাতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ গাউসিয়া কমিটি, রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক টিমের কয়েক হাজার সদস্য ডিপো ও চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন যে মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো বীভৎস। চেনার উপায় নেই। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চকবাজার জোনের সহকারী (এসি) কমিশনার শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাঁচলাইশ থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) মর্গে পাঠাচ্ছে। সেখানে মরদেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ সংগ্রহ করা হবে। যাদের স্বজন নিখোঁজ রয়েছেন তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। ###












