নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা ও সরকারি খাস জমি দখলের উৎসব বন্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।
শনিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলনকক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন সংক্রান্ত সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়।
সভায় বেহাত হওয়া সরকারি খাস জমি উদ্ধারে জোর দেওয়া হয়। এসময় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য কমাতে র্যাব-পুলিশকে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে অস্থায়ী ক্যাম্প করার কথা বলা হয়। সেখানে পাহাড়কে বাঁচিয়ে রেখে স্থাপনা করা সম্ভব বলে জানানো হয়। পাশাপাশি তিন হাজার একর জায়গার মধ্যে দুই হাজার একর জায়গায় কোনো স্থাপনা পরিবেশসম্মতভাবে করা সম্ভব না বলে স্থাপত্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এসময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল আলম, বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফ উদ্দিন, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এস এম আনিসুল হক, ডিআইজি (প্রিজন্স) এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কমিশনার ফখরুল আলম, সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান, জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান, জেলার এসপি এস এম রাশিদুল হক, র্যাব-৭-এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইউসুফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
খাস জমি দখল করে ১৫ হাউজিং সোসাইটি
সভায় জানানো হয়, জঙ্গল সলিমপুর, জঙ্গল লতিফপুরসহ আশপাশের সরকারি খাস জমি দখলে নিতে ১৫টি সমবায় সমিতির নামে হাউজিং সোসাইটি খোলা হয়েছে। এসব সংগঠন অনুমোদন দিয়েছে সমবায় অফিস। এগুলোর মধ্যে ১৩টি সমবায় সমিতি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়। এগুলোকে স্থানীয়ভাবে সমাজ বলা হয়।
সমাজগুলো হচ্ছে, আলী নগর ভূমিহীন সমবায় সমিতি, ছিন্নমূল বহুমুখী সমবায় সমিতি, একতা ভূমিহীন সমবায় সমিতি, নুর নবী শাহ হাউজিং সমবায় সমিতি, জঙ্গল সলিমপুর জনকল্যাণ কর্মজীবী সমবায় সমিতি, গোলপাহাড়া ভূমিহীন সমবায় সমিতি, আল মদিনা সমবায় সমিতি, মায়ের আঁচল সমবায় সমিতি, ভিত্তিহীন সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল সংগ্রামী বস্তিবাসী সমন্বয় পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা হাউজিং সমবায় সমিতি, নবী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি এবং আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি।
১১টি জঙ্গল সলিমপুর এবং ২টি আলী নগরে। প্রত্যেকটি সমাজের সমাজপতিরা একেক জন মাফিয়া ডন হিসেবে সভায় উল্লেখ করা হয়। তারা ৩০০ টাকার নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে সরকারি জায়গার দখল বিক্রি করে। ২০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ টাকায় এসব দখল বিক্রি হয় বলে সভায় জানানো হয়। এভাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করে আসছে।
জঙ্গল সলিমপুর যেন আরেক ‘সাম্রাজ্য’
আলী নগর প্রবেশে সরকারি কর্মকর্তাদেরও পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। কোনো অ্যানড্রয়েড মোবাইল নেওয়া যায় না। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রাস্তায় প্রবেশের মুখে সোর্স বসিয়ে দেওয়া হয়। ওই এলাকায় অপরিচিত লোক প্রবেশ করলে রাস্তার প্রবেশমুখ থেকে ভেতরে থাকা লোকজনের জানিয়ে দেওয়া হয়। পরে ভেতরে থাকা কর্মীরা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে লোকজনদের আটকান।
এখানে জেলা প্রশাসন ২০১৭ সালে ও ২০১৯ সালে উচ্ছেদে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়। তারা রাস্তায় নারীদের দিয়ে মানববর্ম তৈরি করে কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা দেন। ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবও সলিমপুর পরিদর্শনে গেলে নারীদের দিয়ে মানববর্ম তৈরি করা হয়। এখানে একটি দেশের ভেতরে আরেকটি দেশ তৈরি করেছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। এখানে ২০০৭ সালের পর থেকে বেশি দখল হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা দাগী আসামিরা এখানে অবস্থান করে। একেক জনের বিরুদ্ধে ৪-৫টি করে খুনের মামলাও রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে গেলে সেখানে সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনের নেতৃত্বে প্রশাসনের গাড়ি বহর থেকে স্থানীয় ইউপি মেম্বারকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করা হয়। এরপর মামলা হলে ইয়াসিনসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরই মধ্যে ইয়াসিন বাদে পাঁচজন জামিনে বেরিয়ে এসেছেন বলে সভায় জানানো হয়।
কৌশলে কাটা হয় পাহাড়
রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মনে হবে সুন্দর পাহাড় আছে। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, পাহাড়গুলো কেটে সমতল বানিয়ে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়। সুন্দর করে পাহাড় কেটে প্রথমে চারিদিকে ঘেরাও দেওয়া হয়। পরে ঘেরাওয়ের মধ্যে খননযন্ত্র দিয়ে পাহাড় কেটে সমতল বানিয়ে ফেলা হয়। এভাবে কয়েকশো একর পাহাড় এরই মধ্যে কেটে বসতি বানানো হয়েছে। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার কারণে বর্ষাকালে ধসে চট্টগ্রামে ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫৭ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে এ এলাকাতেই পাহাড় ধসে পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে সভায় জানানো হয়।
খাস জমি দখলে সহযোগী পিডিবি
সভায় জানানো হয়, জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে পাহাড় কাটা ও খাস জমি দখলের অন্যতম সহযোগী পিডিবি। এখানে বিদ্যুতের ১১কেভির সঞ্চালন লাইন থেকে ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন। খাস জমি দখল পাকাপোক্ত করতে বড় মসজিদ বানিয়ে প্রথমে ওই মসজিদে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মিটারে সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২০ টাকা করে নেওয়া হয়।
বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পিডিবির বক্তব্য জানতে চাইলে পিডিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, ২০১৬-২০১৭ সালে কোনো দালিলিক ভিত্তি ছাড়াই বিদ্যুতের লাইনগুলো নির্মাণ ও সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ প্রজেক্টের মাধ্যমে বিভিন্ন লোকজনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে লাইনগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। এরইমধ্যে ভূমিমন্ত্রীর নির্দেশনায় আলী নগরের বিদ্যুতের লাইন তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে এখনো প্রায় দুই কিলোমিটার ১১কেভি সঞ্চালন লাইন ও ৪৪০ ভোল্টের সরবরাহ লাইন রয়েছে। এতে ১০-১২টি বড় ট্রান্সফরমার রয়েছে।
সম্ভাবনাও কম নয়
জঙ্গল সলিমপুরসহ ৫ মৌজায় প্রায় তিন হাজার একরের মতো খাস জমি উদ্ধার করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সরকারি দপ্তর স্থানান্তর করা গেলে অধিগ্রহণ ব্যতিত খাস জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। এতে প্রকল্প ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে। চট্টগ্রাম নগরী, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর থেকে সহজে যোগাযোগ সুবিধা রয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং পরিকল্পিত উপায়ে সবুজায়ন ও বনায়ন করা সম্ভব হবে বলে সভায় জানানো হয়।
এতে চট্টগ্রাম নগরীর ওপর চাপও কমবে বলে সভায় বলা হয়। এরইমধ্যে স্পোর্টস ভিলেজ, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, সাফারি পার্ক, ইকো পার্কসহ বিনোদনকেন্দ্র, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, উচ্চক্ষমতার বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কাস্টমস ডাম্পিং হাউজ, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন, সবুজ শিল্প এলাকা, আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার জন্য প্রত্যাশী সংস্থাগুলো জায়গা চেয়ে জেলা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছে।












