এক বছর ধরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে এক সহকারী শিক্ষিকার দ্বন্দ্ব চলছিল। এই দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েন বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা। থানায় পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আদালতে মামলা পর্যন্ত করা হয়। শিক্ষকদের এই দলাদলি ও বিভেদে নষ্ট হয় শিক্ষার পরিবেশ।
বিষয়টি নিয়ে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির সুপারিশের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ১৭ জন শিক্ষককেই একযোগে বদলি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের পটিয়া পৌর সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে বদলির পর বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে একজন করে ১৭ জন শিক্ষককে সেখানে পদায়ন করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আতিকুল মামুন বলেন, ‘শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অত্যন্ত যুগোপযোগী ও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আগামী দিনে আর কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দলাদলি ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্ন ঘটানোর অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকবেন।’
শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা উম্মে হাবিবা চৌধুরী নিয়মিত ক্লাস এবং তাঁর দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতেন না। গত বছর এ নিয়ে কথা বললে প্রধান শিক্ষক মো. হারুনুর রশিদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
এ সময় হাবিবার পক্ষ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়ব সোহেল। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ এনে গত বছরের ২২ আগস্ট পটিয়া থানায় জিডি করেন হাবিবা।
স্কুলের সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল বিতরণসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ তুলে গত ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের সভায় প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদকে পেটাতে উদ্যত হন অভিযুক্ত সোহেল। এ সময় বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ অন্যরা তাঁকে নিবৃত্ত করেন। ঘটনার পরদিন ২ জানুয়ারি সোহেলের নামে পটিয়া থানায় জিডি করেন প্রধান শিক্ষক।
একই দিন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে পাল্টা জিডি করেন সোহেল। এর পরের দিন ৩ জানুয়ারি সহকারী শিক্ষিকা উম্মে হাবিবা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ এনে ৫০৬ ধারায় আদালতে মামলা করেন।
এ নিয়ে ৫ জানুয়ারি ইউএনওর কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। সেই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি জিডি ও মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। গঠন করা হয় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি।
এরপর পাল্টাপাল্টি জিডি প্রত্যাহার করা হলেও মামলা প্রত্যাহার করেননি হাবিবা। শিক্ষকদের দলাদলি ও বিরোধ আরো প্রকট হয়। নষ্ট হয় শিক্ষার পরিবেশ।
এসব ঘটনা তদন্ত করে উপজেলা শিক্ষা অফিসের একটি প্রতিবেদন গত ২৯ জানুয়ারি ইউএনও বরাবর পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে প্রাথমিকভাবে অন্তত আট থেকে ১০ জন শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করে পদগুলোতে অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদায়নের সুপারিশ করা হয়।
পরে এ প্রতিবেদন উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসক ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠায়। তাঁদের দুজনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ১৭ জনকে বদলি ও পদায়নের আদেশ দেয়। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাসরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত আদেশে জারি করা হয় গত ১৩ জুন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদকে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সহকারী শিক্ষক উম্মে হাবিবা চৌধুরীকে পাইকপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, আক্তার জাহান চৌধুরীকে মিলনচক্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মো. নাছের উদ্দিনকে লালারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, নার্গিস জাহান আকতারকে সুচক্রদণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, রীতা চৌধুরীকে গুয়াদণ্ডী রহমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, আকলিমা বেগমকে করল সুমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সামশুন্নাহারকে বাহুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, হালিমা বেগমকে কোলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, তাহমিনা আকতারকে চরকানাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সালমা বেগমকে গৈড়লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, রতন কান্তি দাশকে পূর্ব ডেঙ্গাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মৌসুমী দেবকে দক্ষিণ সমুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, শাহজাহানারা বেগমকে আল্লাই ওখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সুপ্রীয়া চৌধুরীকে ধলঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, শর্মিলা দাশকে হরিণখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সুমন দাশকে জিরি হাজী মীর আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু আহমদ বলেন, শিক্ষকদের দলাদলির কারণে স্বনামধন্য ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। এ কারণে একযোগে সব শিক্ষককে বদলি করে সেখানে অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদায়ন করা হয়েছে। গত বুধবার তাঁরা এ বদলির আদেশ পান। আদেশ পেয়ে শিক্ষকরা বৃহস্পতিবার বদলি করা বিদ্যালয়ে যোগদানপত্র দাখিল করছেন।












