চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেছেন, তামাকজনিত রোগ, অকালমৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারি ও বেসরকারি সকল পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে আজ ১৬ জুন মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত র্যালি পরবর্তী আলোচনা সভা, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক তামাক বিরোধী সেমিনার এবং বিভাগীয় ত্রৈমাসিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল-‘মুখোশ ভাঙো, আসক্তি ছাড়ো, তামাক-নিকোটিনমুক্ত জীবন গড়ো’। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় র্যালি, সভা ও সেমিনারের আয়োজন করেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোঃ মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে, সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইনামুল হাছানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের সভা ও সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ জাহিদ হোসেন মোল্লা, জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অপু মারমা। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক আবদুস সালাম, জেলা ক্রীড়া অফিসার আবদুল বারী, কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ তজল্লী আজাদ, চিটাগাং চেম্বারের প্রতিনিধি হাবীবুর রহমান, শহীদুল আলম, ইলমা’র প্রধান নির্বাহী জেসমিন সুলতানা পারু, ইপসার পরিচালক নাসিম বানু শ্যামলী প্রমূখ। সভা ও সেমিনারে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিভাগীয়-জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ, শিক্ষক, এনজিও প্রতিনিধি, চেম্বার প্রতিনিধি, প্রিন্ট ও ইলেট্র্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তামাক বিরোধী সেমিনারের পূর্বে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গন থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। এটি কাজীর দেউরী মোড় ঘুরে পুনঃরায় সার্কিট হাউজ এসে শেষ হয়
আলোচনা সভা ও সেমিনারে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিকল্প অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের বিস্তার উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ, তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা, তামাক বিক্রেতাদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং তামাক কোম্পানির প্রভাব মোকাবিলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, বর্তমান সরকার দেশের যুব সমাজকে তামাক ও মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে ক্রীড়া কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। সরকারের বিশ্বাস, খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, বরং তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচক জীবনবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত তরুণরা তামাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর আসক্তি থেকে দূরে থাকে এবং একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সরকার একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে যুব সমাজকে ক্রীড়ামুখী করতে এবং তাদের ইতিবাচক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর।
ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেন, তামাক চাষে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ও কীটনাশক নদীর পানি এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদীর প্রতিবেশ সংরক্ষণে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছিল। সরকারি গেজেটের ফলে হালদা নদীর তীরবর্তী নির্ধারিত এলাকায় আর কোনো ধরনের তামাক চাষ করা যাবে না।
সেমিনারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি ব্যবহারে শুধু মানুষের অঙ্গই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং পরিবেশ ও রাষ্ট্রকেও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা জঠিল রোগের অন্যতম কারণ ধূমপান। তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরী। তামাকের আসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য মারাতœক হুমকি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এই ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় জেলা টাস্কফোর্স কমিটির মোট ২৮টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে জেলাগুলোতে ২০৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয় এবং ৩০৪টি মামলায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০ টাকা জরিমানা করা হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, অন্যান্য বক্তারা তরুণ ও যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। শুধু পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করলে হবে না, প্রতিবাদের ভাষা শক্ত হতে হবে। সমাজে তরুণ ও যুবকদের মধ্যে অধিকাংশ অপরাধ মাদককে ঘিরে সংঘটিত হচ্ছে। মাদকের অপকারী দিকগুলো থেকে উঠে আসতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে নয়, তামাক, ধূমপান, মাদকের কুফলগুলো জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরতে হবে। তাহলে আমরা মাদকমুক্ত সুস্থ, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো। তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেমিনারে ধূমপানের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তামাকজাত পণ্যের বিভিন্ন ধরণের বিপনন কৌশল সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। একই সঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদারের আহবান জানানো হয়। তামাক চাষের ফলে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি সেমিনারে তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে জানানো হয়, বছরে দেশে এক লাখ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ তামাকজাত দ্রব্য সেবনের প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করে। সে হিসেবে প্রতি ঘন্টায় ১৮ জন মানুষের মৃত্যু ঘটছে। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এবং ১৫ বছরের কম বয়সীদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ তামাক সেবন করে। এক কোটি ৯২ লাখ মানুষ ধূমপান করে। দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ গণপরিবহনে, ৮১ লাখ মানুষ কর্মস্থলে এবং চার কোটির বেশি মানুষ বাসায় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও খৈনী ইত্যাদি (ধোঁয়াবিহীন তামাক) সেবন করে। বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীদের ৪৬ শতাংশ তামাক ব্যবহারকারী। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর দুই দশমিক ৫১ শতাংশের কারণ পরোক্ষ ধূমপান। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে ৪ হাজার ১৩৯টি অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর সিগারেটের প্রায় ১৬ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত ফিল্টার বর্জ্য হিসেবে পরিবেশকে দূষিত করছে। ##












