নিজস্ব প্রতিবেদক
রাউজান উপজেলায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক হানাহানি,বালু ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, বিভিন্ন বিরোধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত এসব হত্যার মধ্যে অন্তত ১৮টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ঘটেছে। সর্বশেষ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫)।
এ ঘটনায় পাঁচ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ব্যস্ত বাজারে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে ওঠায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা অভিযান শুরুর আগেই পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাসুদকে হত্যার মিশনে অংশ নেয় পাঁচ অস্ত্রধারী। তাদের মধ্যে তিনজনের হাতে ছিল পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। যদিও তদন্তের স্বার্থে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তসংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয়রা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে আলোচিত বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অনুসারী রায়হান বাহিনীর সদস্যরা মাকসুদুল হক হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। এ ঘটনায় অস্ত্রধারী পাঁচজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা হলেন, রাউজানের কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রকাশ দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম প্রকাশ দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান এলাকার মোহাম্মদ জাহেদ ও মোহাম্মদ আবছার। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইলিয়াস ও দিদারুল প্রথমে মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। পরে ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার দৌড়ে গিয়ে তাকে লক্ষ্য করে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান বাহিনীর সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীদের পাশাপাশি একটি ব্যাকআপ টিমও মাঠে ছিল। রায়হান রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। নির্বাচনের আগে রায়হানকে অস্ত্রশস্ত্রসহ গিয়াস কাদের চৌধুরীর আশেপাশে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অস্ত্রধারীরা বাজারে আসে। ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদকে লক্ষ্য করে কাছ থেকে গুলি ছোড়ে তারা। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়। পরে আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলিও ছোড়ে হামলাকারীরা। একপর্যায়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহত মাসুদ রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপনের ছোট ভাই। পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং কয়েক মাস ধরে এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই এবং চট্টগ্রাম-রাঙামাটি আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এতে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল।
স্থানীয়দের ধারণা, বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা রাজনৈতিক বিরোধ—যেকোনো একটি বা একাধিক কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন কয়েকটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল বলে দাবি করেছেন অনেকে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, সোমবার দিবাগত রাতে মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। নিহতের ভাই মুহাম্মদ পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে খুন, গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে রাউজানে সহিংসতার এই চক্র বন্ধ হবে না। একইসঙ্গে মাসুদ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিও জানাই।
রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়া পাঁচজন বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর সদস্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। খুনিদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি।











