সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড় জমেছে। ২০২১ সালে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্র্যাংক ৯৫ টাকা হিসেবে)। আগের বছরের চেয়ে এ আমানত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ২০২০ সালে যা ছিল ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে কোনো বাংলাদেশি তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করলে, তার তথ্য এ প্রতিবেদনে নেই।
২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ছিল যা ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৯ সালে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৮ সালে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৫ সালে ৫৫ কোটি ০৮ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৪ সালে যা ছিল ৫০ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৩ সালে ৩৭ কোটি ২০ লাখ এবং ২০১২ সালে ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্র্যাংক। স্বর্ণালঙ্কার, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জমা রাখলে তার আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে আমানতে যোগ হয় না। তবে শুধু সুইস ব্যাংক নয়, অন্যান্য সংস্থা থেকেও টাকা পাচারের তথ্য আসছে।
এ বিষয়ে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফেরত আসবে বলে আশাবাদী। তিনি বলেছেন, ‘আমরা (সরকার) পাচার হয়ে যাওয়া টাকা দেশে ফেরত আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। আশা করছি, টাকা ফেরত আসবে।’
জানা গেছে, দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে। এক বছরে যে টাকা পাচার হয়, তা ৩টি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। ঋণের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ এবং ঘুষ-দুর্নীতির টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে পাচারের তথ্য উঠে আসছে। প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে পাচারকারীদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি সিদ্ধান্তে অর্থ ফিরে আসা তো দূরের কথা, পাচারকারী আরও উৎসাহিত হবে।
advertisement
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে টাকা পাচার বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য উঠে আসছে। আর অর্থ পাচারের এ বিষয়টি সরকারও স্বীকার করেছে। কিন্তু পাচার রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সামনে আসছে না।
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জিএফআইর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬ বছরে দেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার ৯২ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি। গড়ে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর বৈদেশিক বাণিজ্যের ১৮ শতাংশই পাচার হয়। শুধু এক বছরের পাচার করা অর্থ দিয়েই ৩টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। জিএফআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২টি প্রক্রিয়ায় এ অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)।
এ ছাড়া সরাসরি ব্রিফকেস ভরে ডলার নিয়ে যাওয়া, বিওআইপি ব্যবসা, হুন্ডি ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে পিকে হালদার ধরা পড়ার পর পাচারের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। নাটোরের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের কানাডায় অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশি আরেকজন এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার করেছেন সাউথ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসাইন ও ফারইস্টের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। কুয়েতে অর্থ পাচার করেছেন এমপি শহিদুল ইসলাম পাপুল। ফরিদপুরে দুই ছাত্রলীগ নেতারও ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে।












