চট্টগ্রাম নগরের বাসা থেকে ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে। এরপরের দিন চোখ, হাত–পা বাঁধা অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার হয় রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে। । এ ঘটনার সাত বছর পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে নুরুল আলমের স্ত্রী সুমি আকতার নগরের চকবাজার থানায় হত্যামামলা করেন।
মামলায় রাউজান আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে প্রধান করে ১৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাকি আসামিরা হলেন– রাউজান নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এবং বর্তমানে চুয়েট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাবেদ, বাবুল মেম্বার, নাসের প্রকাশ টাইগার নাসের, লিটন, তৈয়ব, ফরিদ, মামুন, আবু জাফর রাশেদ, ইয়ার মোহাম্মদ, সেকান্দর, জসিম, খালেদ, বাবুল রব্বানি, হাসান মোহাম্মদ নাসির ও মোর্শেদ।
ওই ছাত্রদল নেতাকে বাসা থেকে তুলে আনার কাজে নেতৃত্ব দেন পুলিশের এসআই মুহামদ জাবেদসহ একাধিক পুলিশ সদস্য, আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতা–কর্মীরা। এরপর রাতভর অত্যাচারের পর মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় নুরুল আলমকে।
ঘটনার দুই দিন পর আদালতে নুরুল আলমের স্ত্রী সুমি আকতার আমলা করলেও সেই সময় পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আসামিরা মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দেয়নি। এ কারণে নতুন করে মামলা করেন খুনের শিকার ছাত্রদল নেতার স্ত্রী।
যেভাবে খুন করা হয় নুরুল আলমকে
মামলার এজাহারে বলা হয়, রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের সাদার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তৎকালীন সহসাধারণ সম্পাদক নুরুল আলমকে ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে নগরের চন্দনপুরার বাসা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিমের নির্দেশে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। রাউজান থানার এস আই শেখ মুহাম্মদ জাবেদ এই ঘটনায় নেতৃত্ব দেন। এরপর নুরুলকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের মাঠে। সেখানে চোখ ও মুখ-হাত বেঁধে সারা রাত চালানো হয় নির্যাতন। পরে তাঁকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঘটনাস্থলের ৬ কিলোমিটার দূরের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট কর্ণফুলী নদীর তীর রক্ষা বাঁধের ওপর লাশ ফেলে রাখা হয়। পরের দিন ৩০ মার্চ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, মামলার ১৬ নম্বর আসামি হাসান মোহাম্মদ নাসির একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী এবং আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি। সে হত্যাকাণ্ডের পর বিদেশ চলে গেলেও কয়েকমাস আগে ফিরে আসে। বর্তমানে সে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছে।
হাসান নাসির নিয়মিত দুবাইয়ে মাদক পাচার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার কিছু বাহক রয়েছে। তাদের মাধ্যমে সে বিমানযোগে ইয়াবা পাচার করে। ইয়াবা পাচারের মাধ্যমে সে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
এছাড়া সে বাগোয়ান তথা রাউজানে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। কক্সবাজার টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে তার সহযোগিদের মাধ্যমে মাদক এলাকায় বিক্রি করছে। একারণে যুব সমাজ ধংস হয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, হাসান নাসির যুবদল নেতা নুরুল আলম নুরু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। চাঞ্চল্যকর এ মামলার আসামি হয়েও সে এখন প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। সে তার সহযোগি সন্ত্রাসীদের নিয়ে এলাকায় ঘুরাফেরা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এনিয়ে জনমনে আতংক দেখা দিয়েছে। ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে টুশব্দটি পর্যন্ত করতে পারছে না। কেউ তার মাদক ব্যবসা বা অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নির্যাতন। একারনে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
তবে তাকে ধরতে পারছে না পুলিশ! ফলে এ হত্যা মামলার বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত খুনের শিকার ছাত্রদল নেতা নুরুর পরিবার।
তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য এলাবাসি দাবি জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার নুরুলের দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সবাই লেখাপড়া করছেন। আট বছরেও বাবার হত্যাকারীদের বিচার না হওয়ায় তাঁরা হতাশ ছিলেন। এখন সরকার পরিবর্তন হওয়ায় আশায় বুক বেঁধেছেন তাঁরা। কিন্তু আসামি প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করায় তারাও শংকিত।
এক সময় সে বিএনপি নেতা গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারি হিসেবে পরিচিয় দিত কিন্তু এখন সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারি হিসাবে পরিচয় দেয়।
নুরুল আলম নুরুর স্ত্রী সুমি আক্তার বলেন, ‘আমার সামনে বিছানা থেকে নুরুল আলমকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম থেকে তুলে নিয়ে তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়, ভাবতেই বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। আসামিরা কিভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়? আমি স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ফাঁসি চাই।’
জানতে চাইলে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ বলেন, ‘
ছাত্রদল নেতা নুরুলকে তাঁর থানার এলাকা থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল। যার কারণে মামলা তাঁর থানায় রেকর্ড হয়। তবে লাশ পাওয়া যায় রাউজান থানার এলাকায়। তাঁর থানা মামলা নিয়ে কাজ করবে। তবে রাউজান থানার সহযোগিতাও নেবে।












