আইন আদালত উপজেলা চট্টগ্রাম

রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজল হক প্রকাশ্যে, জনমনে আতংক

নিজস্ব প্রতিবেদক
উত্তর চট্টগ্রামের ত্রাস, হত্যা, অপহরণসহ বহু মামলার আসামি ফজলুল হক ওরফে ফজল হক দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকার পর দেশে ফিরে ফের অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খুনসহ নানা অপরাধ কাজে তার নাম বেরিয়ে আসছে। সে রাউজানের মূর্তিমান আতংকে পরিণত গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, পুরনো সহযোগীদের সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত করে তিনি একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। বালি উত্তোলন, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজান মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। রাউজানে হত্যা, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ ও সহিংসতা নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে পুরো উপজেলা এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বুধবার পর্যন্ত রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যার অধিকাংশের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এ অবস্থায় মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। যাদের শনাক্ত পর্যন্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং অপহরণ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছেই। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ ও হামলা এখন এখানকার নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু ও মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং অপহরণ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছেই। এসব সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে যেন পেরে উঠছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজান উপজেলায় অন্তত ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৫টি হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ঘটনাতেই দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এলাকায় অস্ত্রবাজি ও খুনোখুনি অব্যাহত থাকায় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনায় জড়িতদের বড় একটি অংশ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদকে (৫০)। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলেন। একই ইউনিয়নে গত ৫ জানুয়ারি রাতে উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার (৫০)। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
রাউজানে অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন সাইফুদ্দিন ওরফে রিয়াদ (২৫)। পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম রাউজানের চারাবটতলা বাজারসংলগ্ন কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে একদল অস্ত্রধারী যুবদল কর্মী আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করে।
২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাউজানে উপজেলার শ্রমিক দলের এক নেতাকে গুলি করে করে পালিয়ে যান সন্ত্রাসীরা। ঘটনাটি ঘটে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায়। গুলিবিদ্ধ মেহেদী হাসান (৩২) উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাঁকে গুলি করার ঘটনায়ও কাউকে আটক করা যায়নি।
পুলিশ জানায়, রাউজানে ১৮ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনও প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনও ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। হতাহত ব্যক্তিরা বেশিরভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ১৫টি রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়েছে। নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১০ জন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, বাকিদের মধ্যে একজন ব্যবসায়ী এবং বাকি চার জন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এলাকায় অস্ত্রবাজি ও খুনোখুনি অব্যাহত থাকায় আতঙ্কে স্থানীয়রা।
রাউজানে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা হলেন- যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, জানে আলম সিকদার, আলমগীর, আবদুল হাকিম, কমর উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম, মানিক আবদুল্লাহ, মুহাম্মদ সেলিম, দিদারুল আলম। দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর, আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের, মুহাম্মদ হাসান, আবদুল হাকিম,কমরউদ্দিন জিতু, ইব্রাহিম, আবদুল্লাহ মানিক, সেলিম উদ্দিন, দিদারুল আলম রিংকু (৪০), জাহাঙ্গীর আলম, ইউসুফ মিয়া, মুহাম্মদ হাসান প্রমুখ।
সূত্র জানায়, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডে উঠে আসছে ফজল হকের নাম।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ফজল হক নিজের পরিচয় গোপন করতে পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে ‘মফিজুল রহমান’ নামে (পাসপোর্ট নং: EM0766483) দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থান করেন। সেখানে তার বাবার নাম উল্লেখ করা হয় আব্দুস সালাম এবং মায়ের নাম রাবেয়া বেগম। ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়—১৩ নং নোয়াপাড়া ইউনিয়ন, ৪ নং ওয়ার্ড, জহির বাড়ি, গুহ পাড়া। তিনি গোপনে দেশে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম পরিবর্তনের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলাফেরা করছেন বলেও জানা গেছে।
৮০ ও ৯০-এর দশকে উত্তর চট্টগ্রামে ত্রাস সৃষ্টি করা ফজল হকের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। রাউজান, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও কোতোয়ালী থানায় তার বিরুদ্ধে বহু মামলা বিচারাধীন। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। তার আগেই পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে বিদেশে পাড়ি জমান বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯০-এর দশকের শুরু থেকেই নোয়াপাড়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন ফজল হক। ২০০০ সালের দিকে পুলিশি নথিতে তাকে ‘দুর্ধর্ষ’ সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ফজল হক বাহিনী’ এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ত্রাস সৃষ্টি করে। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে নোয়াপাড়া থেকে এই বাহিনীর চারজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এছাড়া গশ্চির নোয়া হাটে ইকবাল জামিল হত্যাকাণ্ড, দিদার মার্কেট ও কামাল বাজারের স্বর্ণের দোকান ডাকাতিসহ বড় বড় অপরাধেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
দেশে ফেরার পর আবারও পুরনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছেন ফজল হক—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অনুসারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর অভিযানে ফজল হকের ছোট ভাই জানে আলম গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
শুধু তাই নয়, ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে যদি জানে আলমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের মহড়ায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাকে উত্তর জেলা কমিটির পদ থেকে বহিষ্কার করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যদি ভিন্ন পরিচয়ে দেশে ফিরে এসে পুনরায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি।

স্থানীয়দের দাবি—দ্রুত তদন্ত করে তার অবস্থান শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হোক, নতুবা রাউজানে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।

Related Posts